بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ • কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামিক জ্ঞান
Showing posts with label হজ. Show all posts
Showing posts with label হজ. Show all posts

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহজভাবে বিস্তারিত

 


হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহজভাবে বিস্তারিত

হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজ সঠিকভাবে আদায় করার জন্য এর ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের কিছু আমল ফরজ, কিছু ওয়াজিব এবং কিছু সুন্নত। কোনো ফরজ ছুটে গেলে হজ সহিহ হয় না। আর কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে নির্দিষ্ট অবস্থায় দম বা অন্য কাফফারার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

হজের ফরজ কয়টি?

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের ফরজ ৩টি।

১. ইহরাম বাঁধা

হজের নিয়ত করে ইহরাম গ্রহণ করা হজের প্রথম ফরজ।

ইহরাম শুধু দুই টুকরা কাপড় পরার নাম নয়। বরং নিয়তসহ হজের জন্য নির্ধারিত অবস্থায় প্রবেশ করাকে ইহরাম বলা হয়।

মীকাত অতিক্রম করার আগে হজের উদ্দেশ্যে ইহরাম গ্রহণ করতে হয়।

২. ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা

৯ জিলহজ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের দ্বিতীয় ফরজ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«الْحَجُّ عَرَفَةُ»

অর্থ: “হজ হলো আরাফা।”
— সুনান আবু দাউদ, সুনান তিরমিজি

আরাফার ময়দানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপস্থিত হওয়া তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা

কাবা শরিফের চারপাশে নির্দিষ্ট নিয়মে তাওয়াফে জিয়ারত করা হজের তৃতীয় ফরজ।

এটিকে তাওয়াফে ইফাদাও বলা হয়।

হজের এই তাওয়াফ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে হয়।

হজের ওয়াজিব কয়টি?

হানাফি ফিকহের কিতাবগুলোতে হজের ওয়াজিবের সংখ্যা গণনায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কারণ কোনো কোনো আলেম একই আমলের বিভিন্ন অংশকে আলাদাভাবে গণনা করেছেন। তাই শুধু একটি সংখ্যা মুখস্থ করার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলো জানা বেশি উপকারী।

নিচে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলো দেওয়া হলো।

১. মীকাত থেকে ইহরাম গ্রহণ করা

হজের উদ্দেশ্যে আগত ব্যক্তি নির্ধারিত মীকাতের আগে ইহরাম গ্রহণ করবেন এবং ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করবেন না।

২. সাঈ করা

সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাতবার সাঈ করা হজের ওয়াজিব।

সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় গিয়ে একবার এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে দ্বিতীয়বার—এভাবে মোট সাতবার সম্পন্ন করতে হয়।

৩. মুযদালিফায় অবস্থান করা

৯ জিলহজ আরাফা থেকে ফিরে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর কিছু সময় মুযদালিফায় অবস্থান করা হানাফি মাযহাবে ওয়াজিব।

এ সময় ফজরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ মুযদালিফায় অবস্থান করা হয়।

৪. সাফা থেকে সাঈ শুরু করা

সাঈ সাফা থেকে শুরু করা ওয়াজিব। যদি কেউ মারওয়া থেকে শুরু করে, প্রথমবারের চলাচল গণনায় আসে না।

৫. সাঈর অধিকাংশ চক্কর সম্পন্ন করা

সাত চক্করের সাঈ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। সাঈর নিয়ম ও ক্রম ঠিক রাখা উচিত।

৬. জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা

হজের নির্ধারিত দিনগুলোতে জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।

১০ জিলহজ জামারাতুল আকাবায় এবং ১১ ও ১২ জিলহজ তিন জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপের বিধান রয়েছে। ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মিনায় থাকলে সেদিনও কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়।

৭. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা

হজের নির্দিষ্ট আমল সম্পন্ন করার পর পুরুষ হাজি মাথা মুণ্ডাবেন (হালক) অথবা চুল ছোট করবেন (কসর)।

হানাফি মাযহাবে চুল কাটার ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত পরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি।

নারীরাও নির্ধারিত পরিমাণ চুল কাটবেন।

৮. তাওয়াফে বিদা করা

মক্কার বাইরে থেকে আগত হাজির জন্য মক্কা থেকে বিদায়ের সময় তাওয়াফে বিদা করা ওয়াজিব।

তবে শরিয়তসম্মত ওজর থাকলে এর বিধান ভিন্ন হতে পারে।

৯. তাওয়াফে জিয়ারত নির্ধারিত সময়ে করা

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাওয়াফে জিয়ারতের জন্য নির্ধারিত সময়ের বিধান রয়েছে। তাই হজের দিনগুলোতে এটি যথাসময়ে আদায় করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।

১০. তাওয়াফে নিয়ম-কানুন মেনে চলা

তাওয়াফের ক্ষেত্রে কাবা শরিফকে বাম দিকে রেখে তাওয়াফ করা, হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে শুরু করা এবং নির্ধারিত সাত চক্কর সম্পন্ন করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

হজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের অনেক সুন্নত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. ইহরামের আগে গোসল করা

ইহরাম গ্রহণের আগে গোসল করা সুন্নত। পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার সঙ্গে হজের প্রস্তুতি নেওয়া উত্তম।

২. ইহরামের আগে সুগন্ধি ব্যবহার করা

ইহরামের কাপড় পরার আগে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। তবে ইহরাম গ্রহণের পর সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান প্রযোজ্য নয়।

৩. তালবিয়া পাঠ করা

ইহরাম গ্রহণের পর বারবার তালবিয়া পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ

উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির।

৪. তাওয়াফের সময় জিকির ও দোয়া করা

তাওয়াফের সময় বেশি বেশি জিকির, দরুদ, ইস্তিগফার ও দোয়া করা উত্তম।

৫. হাজরে আসওয়াদে ইস্তিলাম করা

সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করা সুন্নত। ভিড়ের কারণে অন্য মুসল্লিকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। দূর থেকে ইশারা করেও ইস্তিলাম করা যায়।

৬. রমল করা

পুরুষদের জন্য প্রথম তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে নির্দিষ্ট অবস্থায় রমল করা সুন্নত। রমল হলো কিছুটা দ্রুত ও শক্তভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটা।

৭. ইযতিবা করা

তাওয়াফের সময় পুরুষদের জন্য ইযতিবা করা সুন্নত—অর্থাৎ ইহরামের চাদরের মাঝখানের অংশ ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর রাখা।

তাওয়াফ শেষ হলে আবার দুই কাঁধ ঢেকে নিতে হবে।

৮. মিনা ও অন্যান্য পবিত্র স্থানে বেশি ইবাদত করা

হজের দিনগুলোতে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে সময় কাটানো উত্তম।

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতের সহজ পার্থক্য

ফরজ

হজের অপরিহার্য আমল। তিনটি ফরজের কোনো একটি বাদ পড়লে হজ আদায় হয় না।

ওয়াজিব

হজের গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যিক আমল। কোনো ওয়াজিব ভুলে বা শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া ছুটে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দম বা অন্য বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

সুন্নত

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণীয় আমল। এগুলো পালন করলে হজের আমল আরও সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ হয়।

হজের সময় কোন বিষয়গুলো থেকে সতর্ক থাকতে হবে?

হজের সময় একজন হাজির উচিত—

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।

  • গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীল কথা থেকে বিরত থাকা।

  • ঝগড়া-বিবাদ না করা।

  • অন্য হাজিকে কষ্ট না দেওয়া।

  • ইহরামের নিষেধাজ্ঞা ভালোভাবে মেনে চলা।

  • ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি না করা।

  • বেশি বেশি তালবিয়া, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার করা।

  • হজের প্রতিটি আমল বিশ্বস্ত আলেমের কাছ থেকে শেখা।

হজের মূল শিক্ষা

হজ আমাদের আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, ত্যাগ, ধৈর্য ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমানরা একই পোশাকে, একই কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহর ইবাদত করেন।

হজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের ৩টি ফরজ হলো—ইহরাম গ্রহণ করা, আরাফার ময়দানে নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা এবং তাওয়াফে জিয়ারত করা।

এর পাশাপাশি সাঈ, মুযদালিফায় অবস্থান, জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ, হালক বা কসর, তাওয়াফে বিদাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব রয়েছে। এছাড়া রমল, ইযতিবা, তালবিয়া, জিকির ও দোয়ার মতো অনেক সুন্নত আমল রয়েছে।

হজের মাসআলা অত্যন্ত বিস্তৃত। তাই হজে যাওয়ার আগে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আলেম বা প্রশিক্ষকের কাছ থেকে নিজের হজে তামাত্তু, কিরান বা ইফরাদ অনুযায়ী বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেওয়া উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে হজ আদায় করার এবং কবুল হজের তাওফিক দান করুন। আমিন। আরও পড়তে ক্লিক করুন।


হজের গুরুত্ব ও ফজিলত: কুরআন ও হাদিসের আলোকে


 

হজের গুরুত্ব ও ফজিলত: কুরআন ও হাদিসের আলোকে

হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম। সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার পবিত্র মক্কায় গিয়ে নির্ধারিত নিয়মে হজ পালন করা ফরজ। হজ শুধু একটি ধর্মীয় সফর নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, ত্যাগ, ধৈর্য, তাকওয়া ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য শিক্ষা।

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা একই পোশাকে, একই উদ্দেশ্যে এবং একই রবের সন্তুষ্টির জন্য পবিত্র মক্কায় সমবেত হন। ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব—সব ভেদাভেদ ভুলে সবাই আল্লাহর সামনে নিজেদের বান্দা হিসেবে প্রকাশ করেন।

হজ ফরজ হওয়ার প্রমাণ

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন—

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

অর্থ: “মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তার ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা ফরজ।”

—সূরা আলে ইমরান: ৯৭

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, যেসব মুসলমানের শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে এবং হজে যাওয়ার প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তাদের ওপর জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ।

হজের গুরুত্ব ও ফজিলত

১. হজ ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ

হজ ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ভিত্তির একটি। একজন সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য হজ পালন করা আল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ ফরজ বিধান।

হজের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নির্দেশের প্রতি তার পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে এবং ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের ত্যাগ ও আনুগত্যের স্মৃতি অনুসরণ করে।

২. হজ গুনাহ মাফের বড় সুযোগ

হজের অন্যতম বড় ফজিলত হলো—আল্লাহ তাআলা বান্দাকে গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়ার সুযোগ দেন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করে এবং অশ্লীল কথা ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকে, সে এমনভাবে ফিরে আসে যেন তার মা তাকে আজই জন্ম দিয়েছেন।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস ১৫২১; সহিহ মুসলিম

অর্থাৎ কবুল হজ মানুষের জীবনে একটি নতুন ও পবিত্র অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

৩. কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“এক উমরা থেকে পরবর্তী উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা হয় এবং কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।”

—সহিহ বুখারি, হাদিস ১৭৭৩; সহিহ মুসলিম

তাই একজন মুমিনের জীবনে হজের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত—আল্লাহ যেন তার হজ কবুল করেন।

৪. হজ আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দেয়

হজের প্রতিটি আমলের মধ্যে রয়েছে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা। ইহরামের পোশাক মানুষকে দুনিয়ার অহংকার ও বাহ্যিক মর্যাদা থেকে দূরে থাকার কথা মনে করিয়ে দেয়।

হজের সময় একজন মুসলমানকে ধৈর্য, সংযম, বিনয় ও আল্লাহর স্মরণে মনোযোগী হতে হয়।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা হজের সফরের জন্য বাহ্যিক প্রস্তুতির পাশাপাশি তাকওয়ার প্রস্তুতির কথাও বলেছেন—

“তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো। নিশ্চয়ই সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।”

—সূরা আল-বাকারা: ১৯৭

৫. হজ তাকওয়া বৃদ্ধি করে

হজের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও তাকওয়া সৃষ্টি করা।

হজ পালনকারী ব্যক্তি ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফার ময়দানে অবস্থান, মুজদালিফা ও মিনার বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ করে।

এসব আমল একজন মুসলমানকে মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

৬. হজ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক

হজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম সমাবেশগুলোর একটি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির মুসলমানরা একই স্থানে একত্রিত হন।

কারও পোশাক, ভাষা, দেশ বা সম্পদের কারণে আলাদা মর্যাদা নেই। সবাই আল্লাহর বান্দা এবং সবাই একই কিবলার দিকে মুখ করে ইবাদত করেন।

এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের এক অসাধারণ শিক্ষা।

৭. হজ ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়

হজের সফরে শারীরিক কষ্ট, ভিড়, দীর্ঘ পথ, অপেক্ষা ও নানা ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এসব পরিস্থিতিতে একজন হাজিকে ধৈর্য ধারণ করতে হয়।

ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবার আল্লাহর নির্দেশ পালনে যে ত্যাগ ও আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, হজের বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে মুসলমানরা সেই ত্যাগের কথা স্মরণ করে।

৮. হজ দুনিয়ার মোহ কমিয়ে দেয়

ইহরামের সাদা পোশাক মানুষের মনে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা ও বাহ্যিক পরিচয় সেখানে মুখ্য থাকে না।

এতে একজন মুসলমান উপলব্ধি করতে পারে—মানুষ যত ধনী বা ক্ষমতাবানই হোক, শেষ পর্যন্ত তাকে আল্লাহর কাছেই ফিরে যেতে হবে।

৯. হজ আল্লাহর স্মরণ বাড়ায়

হজের প্রতিটি পর্যায়ে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদতের গুরুত্ব রয়েছে। তালবিয়া, তাওয়াফ, দোয়া, যিকির ও অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করার সুযোগ পায়।

১০. হজ জীবনে পরিবর্তন আনার সুযোগ

হজের প্রকৃত সফলতা শুধু মক্কা-মদিনা সফর করে ফিরে আসার মধ্যে নয়। বরং হজের পর একজন মানুষের জীবনে যদি নামাজ, তাকওয়া, সততা, ধৈর্য, ভালো চরিত্র ও আল্লাহর আনুগত্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটিই হজের বড় ফলাফল।

তাই হজ থেকে ফিরে আগের জীবনে ফিরে না গিয়ে একজন মুসলমানের উচিত নতুনভাবে আল্লাহর আনুগত্যের জীবন শুরু করা।

কবুল হজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য

কবুল হজের ব্যাপারে আলেমগণ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—

  • আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করা।
  • হালাল উপার্জন থেকে হজের খরচ বহন করা।
  • হজের ফরজ ও ওয়াজিব যথাযথভাবে আদায় করা।
  • অশ্লীলতা, গুনাহ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা।
  • মানুষের কষ্ট না দেওয়া।
  • বেশি বেশি দোয়া, যিকির ও ইবাদত করা।
  • হজ শেষে আল্লাহর আনুগত্যপূর্ণ জীবনযাপন করা।

হজের মাধ্যমে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?

হজ আমাদের শেখায়—

আল্লাহর প্রতি আনুগত্য: আল্লাহর নির্দেশই মুমিনের জন্য সর্বোচ্চ।

ত্যাগ: আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রয়োজনে নিজের আরাম ও স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়।

তাকওয়া: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলতে হয়।

ধৈর্য: কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধারণ করতে হয়।

ভ্রাতৃত্ব: সব মুসলমান পরস্পরের ভাই এবং মর্যাদার মূল ভিত্তি তাকওয়া।

আখিরাতের প্রস্তুতি: দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, তাই চূড়ান্ত সফলতার জন্য আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে।

হজ কার ওপর ফরজ?

সাধারণভাবে যে মুসলমানের ওপর হজ ফরজ হওয়ার শর্তগুলো পূরণ হয়, তার জীবনে একবার হজ করা ফরজ। এর মধ্যে সামর্থ্য, শারীরিক সক্ষমতা এবং হজ পালনের নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত সুযোগের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।

হজের বিস্তারিত মাসআলা-মাসায়েল জানার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছ থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

উপসংহার

হজ আল্লাহ তাআলার একটি মহান ফরজ ইবাদত। এটি শুধু পবিত্র মক্কায় গমন বা নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়; বরং এটি ঈমান, তাকওয়া, ত্যাগ, ধৈর্য, আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধির এক মহান প্রশিক্ষণ।

কুরআন হজকে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর ফরজ করেছে এবং সহিহ হাদিসে কবুল হজের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

তাই যাদের ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তাদের উচিত হজের বিধান ভালোভাবে শেখা, হালাল সম্পদ দিয়ে হজের প্রস্তুতি নেওয়া এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ পালন করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হজের গুরুত্ব বোঝার, সামর্থ্য হলে হজ আদায় করার এবং কবুল হজের মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন। আরও পড়তে ক্লিক করুন।