بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ • কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামিক জ্ঞান

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহজভাবে বিস্তারিত

 


হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী সহজভাবে বিস্তারিত

হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজ সঠিকভাবে আদায় করার জন্য এর ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের কিছু আমল ফরজ, কিছু ওয়াজিব এবং কিছু সুন্নত। কোনো ফরজ ছুটে গেলে হজ সহিহ হয় না। আর কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে নির্দিষ্ট অবস্থায় দম বা অন্য কাফফারার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

হজের ফরজ কয়টি?

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের ফরজ ৩টি।

১. ইহরাম বাঁধা

হজের নিয়ত করে ইহরাম গ্রহণ করা হজের প্রথম ফরজ।

ইহরাম শুধু দুই টুকরা কাপড় পরার নাম নয়। বরং নিয়তসহ হজের জন্য নির্ধারিত অবস্থায় প্রবেশ করাকে ইহরাম বলা হয়।

মীকাত অতিক্রম করার আগে হজের উদ্দেশ্যে ইহরাম গ্রহণ করতে হয়।

২. ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করা

৯ জিলহজ সূর্য ঢলে যাওয়ার পর থেকে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের দ্বিতীয় ফরজ।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

«الْحَجُّ عَرَفَةُ»

অর্থ: “হজ হলো আরাফা।”
— সুনান আবু দাউদ, সুনান তিরমিজি

আরাফার ময়দানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপস্থিত হওয়া তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৩. তাওয়াফে জিয়ারত করা

কাবা শরিফের চারপাশে নির্দিষ্ট নিয়মে তাওয়াফে জিয়ারত করা হজের তৃতীয় ফরজ।

এটিকে তাওয়াফে ইফাদাও বলা হয়।

হজের এই তাওয়াফ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন করতে হয়।

হজের ওয়াজিব কয়টি?

হানাফি ফিকহের কিতাবগুলোতে হজের ওয়াজিবের সংখ্যা গণনায় কিছু পার্থক্য দেখা যায়। কারণ কোনো কোনো আলেম একই আমলের বিভিন্ন অংশকে আলাদাভাবে গণনা করেছেন। তাই শুধু একটি সংখ্যা মুখস্থ করার পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলো জানা বেশি উপকারী।

নিচে হানাফি মাযহাব অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিবগুলো দেওয়া হলো।

১. মীকাত থেকে ইহরাম গ্রহণ করা

হজের উদ্দেশ্যে আগত ব্যক্তি নির্ধারিত মীকাতের আগে ইহরাম গ্রহণ করবেন এবং ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করবেন না।

২. সাঈ করা

সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাতবার সাঈ করা হজের ওয়াজিব।

সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় গিয়ে একবার এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফিরে দ্বিতীয়বার—এভাবে মোট সাতবার সম্পন্ন করতে হয়।

৩. মুযদালিফায় অবস্থান করা

৯ জিলহজ আরাফা থেকে ফিরে ১০ জিলহজ সুবহে সাদিকের পর কিছু সময় মুযদালিফায় অবস্থান করা হানাফি মাযহাবে ওয়াজিব।

এ সময় ফজরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ মুযদালিফায় অবস্থান করা হয়।

৪. সাফা থেকে সাঈ শুরু করা

সাঈ সাফা থেকে শুরু করা ওয়াজিব। যদি কেউ মারওয়া থেকে শুরু করে, প্রথমবারের চলাচল গণনায় আসে না।

৫. সাঈর অধিকাংশ চক্কর সম্পন্ন করা

সাত চক্করের সাঈ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। সাঈর নিয়ম ও ক্রম ঠিক রাখা উচিত।

৬. জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা

হজের নির্ধারিত দিনগুলোতে জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব।

১০ জিলহজ জামারাতুল আকাবায় এবং ১১ ও ১২ জিলহজ তিন জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপের বিধান রয়েছে। ১৩ জিলহজ পর্যন্ত মিনায় থাকলে সেদিনও কঙ্কর নিক্ষেপ করা হয়।

৭. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা

হজের নির্দিষ্ট আমল সম্পন্ন করার পর পুরুষ হাজি মাথা মুণ্ডাবেন (হালক) অথবা চুল ছোট করবেন (কসর)

হানাফি মাযহাবে চুল কাটার ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত পরিমাণের প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি।

নারীরাও নির্ধারিত পরিমাণ চুল কাটবেন।

৮. তাওয়াফে বিদা করা

মক্কার বাইরে থেকে আগত হাজির জন্য মক্কা থেকে বিদায়ের সময় তাওয়াফে বিদা করা ওয়াজিব।

তবে শরিয়তসম্মত ওজর থাকলে এর বিধান ভিন্ন হতে পারে।

৯. তাওয়াফে জিয়ারত নির্ধারিত সময়ে করা

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী তাওয়াফে জিয়ারতের জন্য নির্ধারিত সময়ের বিধান রয়েছে। তাই হজের দিনগুলোতে এটি যথাসময়ে আদায় করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি।

১০. তাওয়াফে নিয়ম-কানুন মেনে চলা

তাওয়াফের ক্ষেত্রে কাবা শরিফকে বাম দিকে রেখে তাওয়াফ করা, হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে শুরু করা এবং নির্ধারিত সাত চক্কর সম্পন্ন করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।

হজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের অনেক সুন্নত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

১. ইহরামের আগে গোসল করা

ইহরাম গ্রহণের আগে গোসল করা সুন্নত। পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার সঙ্গে হজের প্রস্তুতি নেওয়া উত্তম।

২. ইহরামের আগে সুগন্ধি ব্যবহার করা

ইহরামের কাপড় পরার আগে শরীরে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত। তবে ইহরাম গ্রহণের পর সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান প্রযোজ্য নয়।

৩. তালবিয়া পাঠ করা

ইহরাম গ্রহণের পর বারবার তালবিয়া পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ

উচ্চারণ: লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির।

৪. তাওয়াফের সময় জিকির ও দোয়া করা

তাওয়াফের সময় বেশি বেশি জিকির, দরুদ, ইস্তিগফার ও দোয়া করা উত্তম।

৫. হাজরে আসওয়াদে ইস্তিলাম করা

সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন বা স্পর্শ করা সুন্নত। ভিড়ের কারণে অন্য মুসল্লিকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। দূর থেকে ইশারা করেও ইস্তিলাম করা যায়।

৬. রমল করা

পুরুষদের জন্য প্রথম তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে নির্দিষ্ট অবস্থায় রমল করা সুন্নত। রমল হলো কিছুটা দ্রুত ও শক্তভাবে ছোট ছোট পদক্ষেপে হাঁটা।

৭. ইযতিবা করা

তাওয়াফের সময় পুরুষদের জন্য ইযতিবা করা সুন্নত—অর্থাৎ ইহরামের চাদরের মাঝখানের অংশ ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের ওপর রাখা।

তাওয়াফ শেষ হলে আবার দুই কাঁধ ঢেকে নিতে হবে।

৮. মিনা ও অন্যান্য পবিত্র স্থানে বেশি ইবাদত করা

হজের দিনগুলোতে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফারে সময় কাটানো উত্তম।

হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতের সহজ পার্থক্য

ফরজ

হজের অপরিহার্য আমল। তিনটি ফরজের কোনো একটি বাদ পড়লে হজ আদায় হয় না।

ওয়াজিব

হজের গুরুত্বপূর্ণ আবশ্যিক আমল। কোনো ওয়াজিব ভুলে বা শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া ছুটে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দম বা অন্য বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।

সুন্নত

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণীয় আমল। এগুলো পালন করলে হজের আমল আরও সুন্দর ও পূর্ণাঙ্গ হয়।

হজের সময় কোন বিষয়গুলো থেকে সতর্ক থাকতে হবে?

হজের সময় একজন হাজির উচিত—

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।

  • গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীল কথা থেকে বিরত থাকা।

  • ঝগড়া-বিবাদ না করা।

  • অন্য হাজিকে কষ্ট না দেওয়া।

  • ইহরামের নিষেধাজ্ঞা ভালোভাবে মেনে চলা।

  • ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি না করা।

  • বেশি বেশি তালবিয়া, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার করা।

  • হজের প্রতিটি আমল বিশ্বস্ত আলেমের কাছ থেকে শেখা।

হজের মূল শিক্ষা

হজ আমাদের আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য, ত্যাগ, ধৈর্য ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসলমানরা একই পোশাকে, একই কিবলার দিকে ফিরে আল্লাহর ইবাদত করেন।

হজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

হানাফি মাযহাব অনুযায়ী হজের ৩টি ফরজ হলো—ইহরাম গ্রহণ করা, আরাফার ময়দানে নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা এবং তাওয়াফে জিয়ারত করা।

এর পাশাপাশি সাঈ, মুযদালিফায় অবস্থান, জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ, হালক বা কসর, তাওয়াফে বিদাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব রয়েছে। এছাড়া রমল, ইযতিবা, তালবিয়া, জিকির ও দোয়ার মতো অনেক সুন্নত আমল রয়েছে।

হজের মাসআলা অত্যন্ত বিস্তৃত। তাই হজে যাওয়ার আগে হানাফি মাযহাবের নির্ভরযোগ্য আলেম বা প্রশিক্ষকের কাছ থেকে নিজের হজে তামাত্তু, কিরান বা ইফরাদ অনুযায়ী বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেওয়া উত্তম।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে হজ আদায় করার এবং কবুল হজের তাওফিক দান করুন। আমিন। আরও পড়তে ক্লিক করুন।


No comments:

Post a Comment