بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ • কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে ইসলামিক জ্ঞান
Showing posts with label ইসলামিক ইতিহাস ​আহলে বাইত ​হযরত ইমাম হাসান রা.. Show all posts
Showing posts with label ইসলামিক ইতিহাস ​আহলে বাইত ​হযরত ইমাম হাসান রা.. Show all posts

ইমাম হাসান বিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু : সংক্ষিপ্ত জীবনী।Imam Hasan bin Ali Radiyallahu Anhu: Short biography






ইমাম হাসান বিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু : এক জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের সংক্ষিপ্ত জীবনী

​হাসান বিন আলী বিন আবু তালিব, আবু মুহাম্মাদ (রা.), রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাতি এবং তাঁর অত্যন্ত প্রিয় নয়নমণি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলীফা।

​হিজরী ৩ সনের রমযান মাসের মাঝামাঝিতে এই মহান ব্যক্তিত্ব পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন।

​দ্বিনী খেদমত ও হাদিস বর্ণনা

​তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ), তাঁর পুত্র আদাহ, আবুল হাওরা, রাবীয়া বিন শিবান, শাবীসহ প্রখ্যাত তাবেঈগণ।

​হজরত আনাস (রাঃ) থেকে বুখারী শরীফে বর্ণিত হয়েছে—

​“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারার সাথে হযরত হাসান (রাঃ)-এর চেয়ে অধিক মিল আর কারো ছিল না।”

​খিলাফত ও ঐতিহাসিক সন্ধি

​ইমাম হাসানের সম্মানিত পিতা হযরত আলী (রাঃ)-এর শাহাদাত লাভের পর তিনি ছয় মাস খিলাফতের মসনদ অলংকৃত করেন। কুফাবাসী তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে।

​পরবর্তীতে হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) বিরোধ নিরসনে এগিয়ে এলে, ইমাম হাসান (রাঃ) একটি শর্তে খিলাফতের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেন—যে, তাঁর (মুয়াবিয়া রাঃ) পর খিলাফত মুসলিম উম্মার ঐক্য ও পরামর্শের অধীনে পরিচালিত হবে। মুয়াবিয়া (রাঃ) এই শর্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব রূপ লাভ করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন:

​“আমার এ নাতি (হাসান বিন আলী) মুসলমানদের দুটি বৃহৎ দলের মধ্যে সন্ধি স্থাপন করবে।”

​তিনি ৪১ হিজরীর রবিউল আউয়াল (কিংবা রবিউস সানী) মাসে মুসলিম ঐক্যের স্বার্থে খিলাফতের মসনদ বর্জন করেন। তাঁর শান্ত ও নম্র স্বভাবের কারণে বন্ধুমহল তাঁকে “غار المؤ منين” (মুমিনদের মধ্যে লজ্জাশীল ও শান্ত ব্যক্তি) বলে সম্বোধন করতেন। একবার এ বিষয়ে তিনি বলেন, “‘আর’ (লজ্জা) শব্দটি ‘নার’ (অগ্নি) থেকে অনেক শ্রেয়।”

​একদিন এক ব্যক্তি এসে তাঁকে কিছুটা কটূক্তি করে বলেন, "السلام عليكم يا مذل المؤ منين (হে মুসলমানদের লাঞ্ছিতকারী, আপনার প্রতি সালাম)!"

উত্তরে তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে বলেন, "আমি মুসলমানদের লাঞ্ছিতকারী নই। বরং আমি রক্তপাত ও যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছি, কারণ আমি তোমাদের রাজত্বের জন্য রক্তারক্তির দিকে ঠেলে দেওয়াকে সবচেয়ে জঘন্য কাজ মনে করি।" এরপর তিনি কুফা ছেড়ে মদীনা শরীফে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

​শাহাদাত ও বিষপ্রয়োগের নেপথ্য কাহিনী

​ইমাম হাসানের স্ত্রী জাআদ বিনতে আশয়াস বিন কায়েসকে মদীনায় ইয়াযিদ গোপনে প্ররোচনা দেয় যে, সে যদি হাসানকে বিষ প্রয়োগ করতে পারে, তবে সে তাকে বিবাহ করবে। সেই দুনিয়াবী ধোঁকায় পড়ে সে তাঁকে বিষ পান করায়। ফলশ্রুতিতে ৪৯ হিজরী (মতান্তরে ৫০ হিজরীর) রবিউল আউয়াল মাসের ৫ তারিখে তিনি বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

​শহীদ হওয়ার পর কুচক্রী ইয়াযিদের কাছে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করানো হলে সে তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলে, "যে নারী নিজের স্বামীর সাথে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, আমি তাকে কীভাবে নিজের জন্য গ্রহণ করব?"

​ইন্তেকালের পূর্বে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) বারবার বিষ প্রয়োগকারীর নাম জানতে চাইলে তিনি মহানুভবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বলেন:

​"হত্যাকারীকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আমার নিশ্চিত সন্দেহ রয়েছে। যদি সে প্রকৃত হত্যাকারী না হয়, তবে কেন আমি নিরপরাধ এক ব্যক্তিকে শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাবো? এর আসল বিচার আল্লাহর হাতেই রইল।"

​শেষ ওসীয়ত এবং জান্নাতুল বাকীতে দাফন

​মৃত্যুর প্রাক্কালে হযরত হাসান (রাঃ) তাঁর ভাই হুসাইন (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলেন:

​"রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর পিতা আলী খিলাফত প্রত্যাশা করেছিলেন; কিন্তু আবু বকর (রাঃ) খিলাফত লাভ করেন। এরপর উমর (রাঃ) এবং পরবর্তীতে উসমান (রাঃ) খলীফা হন। উসমানের শাহাদাতের পর আলী খলীফা হলে উভয় পক্ষ থেকে তলোয়ার নিষ্কাশিত হয়। তখন আমি বুঝে গেছি, আমাদের বংশে খিলাফত এবং বাহ্যিক শাসন একীভূত নাও হতে পারে। তাই কুফার নির্বোধ লোকদের প্ররোচনায় তুমি কখনো খিলাফতের মোহে অস্ত্র ধারণ করো না।"

​তিনি আরও ওসীয়ত করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র রওজা মোবারকের পাশে তাঁকে দাফন করার জন্য যেন উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ)-এর অনুমতি নেওয়া হয়।

​ইমাম হাসানের ইন্তেকালের পর হযরত হুসাইন (রাঃ) আয়েশা (রাঃ)-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি সানন্দে তা মঞ্জুর করেন। কিন্তু মারওয়ান বিন হাকামের বাধার কারণে জানাজায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের উপক্রম হয়। শেষ পর্যন্ত ইমাম হাসানের পূর্ব ওসীয়ত অনুযায়ী—যাতে কোনো রক্তপাত না হয়—তাঁকে জান্নাতুল বাকীতে হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এর পাশে দাফন করা হয়।

​একটি মহান আত্মত্যাগ, শান্তি এবং উম্মার ঐক্যের প্রতীক হয়ে ইমাম হাসান (রাঃ)-এর জীবন মুসলিম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর অশেষ রহমত বর্ষণ করুন।