সফর মাসের গুরুত্ব ও আমল: কুসংস্কার নয়, ইবাদতের মাস
প্রকাশিত: ১৮ জুলাই ২০২৬
বিষয়: ইসলাম | হিজরি মাস | সফর মাস
হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস হলো সফর। অনেকের মধ্যে এখনও এই মাসকে অশুভ মনে করার একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ নতুন কাজ শুরু করেন না, কেউ বিয়ে বা ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন। অথচ ইসলামে এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। বরং কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে সফর মাসও অন্যান্য মাসের মতোই বরকতময় এবং ইবাদতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস।
সফর মাসের অর্থ ও নামকরণের কারণ
‘সফর’ (صفر) শব্দের অর্থ শূন্য বা খালি। ইতিহাসবিদদের মতে, জাহেলি যুগে আরবরা মহররম মাসে যুদ্ধ বন্ধ রাখার পর সফর মাসে আবার যুদ্ধ ও সফরে বের হয়ে যেত। ফলে তাদের বসতিগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ত। এ কারণেই এই মাসের নাম রাখা হয় সফর।
সফর মাস কি অশুভ?
ইসলামপূর্ব যুগে আরবদের বিশ্বাস ছিল, সফর মাস অশুভ এবং এ মাসে নানা বিপদ-আপদ নেমে আসে। কিন্তু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই কুসংস্কারকে সম্পূর্ণভাবে বাতিল করেছেন।
তিনি বলেন:
"কোনো অশুভ লক্ষণ নেই, পেঁচার মধ্যে অকল্যাণ নেই এবং সফর মাসে কোনো অশুভতা নেই।"
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৫৭
অতএব, সফর মাসকে অশুভ মনে করা বা এ মাসে কোনো কাজ করতে ভয় পাওয়া ইসলামী আকিদার পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন—
"তোমরা সময়কে গালি দিও না; কারণ আল্লাহই সময়ের নিয়ন্ত্রক।"
— সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৮২৭
এর অর্থ হলো, সময়ের নিজস্ব কোনো ভালো বা মন্দ ক্ষমতা নেই। সবকিছুই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ফয়সালায় সংঘটিত হয়।
সফর মাসে ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনা
সফর মাস ইসলামের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা হলো—
৭ম হিজরির সফর মাসে মুসলমানরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে খায়বার বিজয় লাভ করেন।
১৬ হিজরির সফর মাসে হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলমানরা পারস্যের রাজধানী মাদায়েন বিজয় করেন।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে সফর মাস কোনো অশুভ মাস নয়; বরং এটি মুসলমানদের গৌরবময় ইতিহাসের একটি অংশ।
সফর মাসের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ নামাজ, রোজা বা দোয়া সহিহ হাদিসে বর্ণিত নেই। তবে অন্যান্য মাসের মতো এ মাসেও বেশি বেশি নেক আমল করা উত্তম।
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করা
সময়মতো জামাতের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায়ের চেষ্টা করুন এবং নফল ইবাদত বৃদ্ধি করুন।
২. কুরআন তিলাওয়াত
প্রতিদিন নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
৩. আইয়ামে বীযের রোজা
প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখা মুস্তাহাব।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
"আইয়ামে বীযের রোজা রাখা যেন সারা বছর রোজা রাখার সমান।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৪৪৯
৪. সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত সোমবার ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা রাখতেন। সফর মাসেও এই সুন্নত আমল পালন করা যায়।
৫. জিকির, ইস্তিগফার ও দোয়া
বেশি বেশি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আস্তাগফিরুল্লাহ পাঠ করুন। আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
৬. দান-সদকা ও সৎকর্ম
গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং মানুষের উপকার করা মহান সওয়াবের কাজ।
সফর মাসে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা
❌ সফর মাস অশুভ।
❌ এ মাসে বিয়ে করা যাবে না।
❌ নতুন ব্যবসা শুরু করা যাবে না।
❌ সফরের শেষ বুধবার বিশেষ নামাজ বা বিশেষ ইবাদত করতে হবে।
এসব বিশ্বাসের কোনো সহিহ শরয়ি ভিত্তি নেই। তাই এসব কুসংস্কার থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
উপসংহার
সফর মাসকে অশুভ মনে করা জাহেলি যুগের একটি ভিত্তিহীন বিশ্বাস। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, আল্লাহর সৃষ্টি প্রতিটি সময়ই কল্যাণময়। তাই কুসংস্কার পরিহার করে সফর মাসে নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত করণীয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুসংস্কারমুক্ত জীবনযাপন এবং সহিহ আকিদার ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন। আরো পড়তে ক্লিক করুন

0 comments:
Post a Comment